অধ্যায় ১: পরিমাপ
পদার্থবিজ্ঞানের কিছু জটিল ও বিমূর্ত তত্ত্ব গাণিতিকভাবে অত্যন্ত সুন্দর হলেও, পদার্থবিজ্ঞান মূলত একটি পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান। তাই যারা সূক্ষ্ম ও নির্ভুল পরিমাপ করেন, তাদের জন্য এমন কিছু অভিন্ন মানদণ্ডে একমত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার মাধ্যমে পরিমাপের ফলাফল প্রকাশ করা যায়।
এর ফলে এক গবেষণাগার থেকে অন্য গবেষণাগারে ফলাফল পাঠানো এবং তা যাচাই করা সম্ভব হয়।
এই অধ্যায়ে আমরা কিছু মৌলিক ভৌত রাশি, তাদের একক এবং পরিমাপের জন্য গৃহীত মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করব। একই সঙ্গে হিসাব ও পরিমাপের ফলাফল কীভাবে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে হয়, উপযুক্ত মাত্রা (dimension) এবং সার্থক অঙ্ক (significant figures) কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তাও আলোচনা করা হবে।
এছাড়া সমীকরণে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাশির মাত্রা সঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করার গুরুত্বও দেখানো হবে। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও মৌলিক ও উৎপন্ন একক পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।
১-১ ভৌত রাশি, মানদণ্ড এবং একক
Physical Quantities, Standards, and
সংজ্ঞাভৌত রাশি হলো এমন একটি রাশি যা পরিমাপ করা যায়।
মনে রাখুনSI পদ্ধতিতে দৈর্ঘ্যের মৌলিক একক হলো মিটার।
উদাহরণকোনো বস্তুর বেগ:
সতর্কতাএকক ছাড়া পরিমাপের মান অসম্পূর্ণ হতে পারে।
পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো অনেক ধরনের ভৌত রাশির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। যেমন—
- ভর (mass)
- দৈর্ঘ্য (length)
- সময় (time)
- বল (force)
- বেগ (speed)
- ঘনত্ব (density)
- বৈদ্যুতিক রোধ (resistance)
- তাপমাত্রা (temperature)
- আলোক তীব্রতা (luminous intensity)
- চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতা (magnetic field strength)
ইত্যাদি।
প্রত্যেকটি শব্দের একটি নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে এবং এগুলো বিজ্ঞানীদের মধ্যে যোগাযোগের একটি সাধারণ ভাষা হিসেবে কাজ করে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন পদার্থবিদ যখন গতিশক্তি (kinetic energy) বলেন, তখন অন্য পদার্থবিদরাও বুঝতে পারেন তিনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন।
প্রত্যেকটি ভৌত রাশি পরীক্ষাগারে পরিমাপযোগ্য। তাই শুধু রাশির অর্থে নয়, তার মান প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত এককেও সবার মধ্যে একমত হতে হয়।
তা না হলে বিভিন্ন গবেষণাগারের পরীক্ষার ফলাফল একে অপরের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব হবে না।
পরিমাপের মানদণ্ড
পরিমাপের এককের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড (standard) তৈরি করতে হয়।
ধরা যাক, কোনো দৈর্ঘ্য মাপা হলো:
এর অর্থ, মাপা দৈর্ঘ্যটি “এক মিটার” হিসেবে গৃহীত মানদণ্ডের তুলনায় 4.3 গুণ।
যদি দুটি গবেষণাগার একই মিটারের মানদণ্ড ব্যবহার করে, তবে তাদের ফলাফল সহজেই তুলনা করা যায়।
একটি ভালো মানদণ্ডের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত:
- এটি সহজে ব্যবহারযোগ্য বা accessible হতে হবে।
- সময়, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ইত্যাদি পরিবর্তনের সঙ্গে এর মান পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়; অর্থাৎ এটি invariable হতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে পরিমাপের মানদণ্ড তৈরি ও সংরক্ষণের প্রধান দায়িত্ব National Institute of Standards and Technology (NIST)-এর।
আন্তর্জাতিকভাবে মানদণ্ড নির্ধারণে General Conference on Weights and Measures (CGPM) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মৌলিক রাশি
সব ভৌত রাশির জন্য আলাদা মৌলিক মানদণ্ড তৈরি করার প্রয়োজন নেই।
কিছু রাশিকে মৌলিক রাশি (fundamental quantities) হিসেবে ধরা যায় এবং বাকিগুলোকে সেগুলো থেকে নির্ণয় করা যায়।
উদাহরণস্বরূপ,
এক সময় দৈর্ঘ্য ও সময়কে পৃথক মৌলিক রাশি ধরা হতো।
- দৈর্ঘ্যের একক ছিল meter
- সময়ের একক ছিল second
কিন্তু আলোর বেগ এমন নির্ভুলভাবে মাপা সম্ভব হয়েছে যে বর্তমানে দৈর্ঘ্যের মানদণ্ডকে আলোর বেগ এবং সেকেন্ডের সাহায্যে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে পরিমাপের নির্ভুলতা বাড়লে প্রচলিত মানদণ্ডও পরিবর্তিত হতে পারে।